সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : বন্ধ হয়ে গেল বড় বাজারের প্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকান দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভান্ডার। লকডাউন এর অন্যতম কারণ তা বোঝা গিয়েছিল নিউ নর্মাল শুরু হওয়ার পরেই। বেশিরভাগ সময়েই এই বিখ্যাত দোকানের শাটার হয় বন্ধ থাকতো নয়তোবা অর্ধেক খোলা থাকত। বোঝা যাচ্ছিল যে বিখ্যাত এই মিষ্টির দোকানে সমস্যা চলছে। শেষ পর্যন্ত তা প্রকট হল এবং বন্ধ হল প্রায় ৯০ বছরের এই বাঙালি মিষ্টি প্রতিষ্ঠান।
পুরনো কলকাতার গল্প তাদের একটি ‘ওয়াকে’ গিয়ে এই বিখ্যাত দোকান বন্ধ হওয়ার কারণ জানতে পারেন। ফেসবুক গ্রুপের অন্যতম প্রধান জয়ন্ত সেন জানিয়েছেন, ‘আমাদের হেরিটেজ ওয়াকে’র সাক্ষী এই বিখ্যাত ও ততোধিক জনপ্রিয় এই দোকান। মিহিদানা তো আছে পাশাপাশি বিখ্যাত ছিল এঁদের হিঙের কচুরি।’ জয়ন্তবাবুর কথায়, ‘এই বন্ধ হওয়া দোকানটির ঠিক পাশেই রয়েছে আরও একটি ছোট্ট কচুরির দোকান। ওঁদেরই শরিক। ওই দোকানের মালিকের বক্তব্য, বংশে সেইরকম লোক না থাকার কারণেই এই দোকান উঠে গিয়েছে’। জানা যাচ্ছে শুধু বন্ধ নয় বিক্রিও হয়ে গিয়েছে। জয়ন্তবাবু বলেন, ‘বড়বাজারে কোনও দোকান বন্ধ হয়ে যায় না, তাও আবার ওইরকম লোকেশনে। কিন্তু ঘটনাটি ঘটেছে এবং এমন জায়গা, তাই পড়েও থাকেনি। বিক্রিও হয়ে গিয়েছে।’ ওই শরিক ফেসবুক গ্রুপের কাছে দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিকের সুখ্যাতি করেন এবং সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনিও খুব ব্যথিত বলে জানিয়েছেন।
বিখ্যাত মিষ্টির দোকানের মিহিদানা খেয়ে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। তাই আর কোনও সাত পাঁচ না ভেবে দেশবন্ধুর নামেই নামাকরণ করা হয়েছিল এই দোকানের। কৃষ্ণচন্দ্র দে, পঙ্কজ কুমার মল্লিকের মতো প্রসিদ্ধ গায়করা এখানকার নিয়মিত খরিদ্দার ছিলেন। আসতেন বিখ্যাত কথা শিল্পী দাদাঠাকুর, বিদ্রোহী পদ্মজা নাইডুও।
অনেকেই এই দোকানের মিষ্টির স্বাদের স্মৃতি রোমন্থন করেছেন। অনেকে হতাশ। সোশ্যাল মাধ্যমেই তাঁরা তাদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। কেউ বলছেন , ‘এখন আর কী’ই বা করার আছে’। পিকেজি গ্রুপের আরও এক প্রধান সদস্য স্বর্ণালী চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘লকডাউনের পর দুটি ধাক্কা। বহু স্মৃতির সাক্ষী চৌরঙ্গীর ইন্দ্রমহল এবং মহাত্মা গান্ধী রোডের দেশবন্ধু বন্ধ হয়ে গেলো।’ প্রসঙ্গত এঁদেরই একটি শাখা ছিল লেক মার্কেটের উল্টোদিকে। হাজরা ল্যান্সডাউন ক্রসিংএর কাছেও ছিলদোকান। জানা গিয়েছে দুটিই বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
ফেসবুক গ্রুপের সদস্য বর্ণালি চট্টোপাধ্যায় আবার এই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তিনি জানাচ্ছেন , ‘এদের সবাই অন্য কাজ করেন, কারিগর রা তাই পয়সার গোলমাল করে এবং ওরা লাভ করতে পারতেন না সেভাবে। তাই লকডাউনের সময় ব্যবসা উঠিয়ে দিলেন হয়তো। এদের মিহিদানা আর কালোজাম অতুলনীয়। অনেকেই জানেন না হয়তো, এই দোকানের সৃষ্টি যিনি করেন, তার ছবি অনেকেই দোকানে টাঙানো দেখেছেন। একজন অত্যন্ত জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। দর্শন শাস্ত্রে পণ্ডিত ছিলেন ইনি।’
সবমিলিয়ে বাস্তব ঘটনা হল মিস্টি প্রিয় বাঙালির কাছে দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভান্ডার বন্ধ হওয়া এক বেদনাময় বার্তা। সেই সঙ্গে হারিয়ে গেল চিত্রকূট, কালোজাম, সীতাভোগ,মিহিদানা, কচুরি, শিঙাড়ার অতুলনীয় স্বাদ।
